২০২৬ সালে ঘরে বসে অনলাইনে ই-পাসপোর্ট আবেদন করার সহজ নিয়ম, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ৫ ও ১০ বছর মেয়াদের ফি তালিকা, বায়োমেট্রিক দেওয়ার নিয়ম এবং পাসপোর্ট স্ট্যাটাস চেক করার উপায় নিয়ে স্টেপ-বাই-স্টেপ গাইড।
অনলাইনে ই-পাসপোর্ট আবেদন করার সহজ নিয়ম ২০২৬ (কাগজপত্রসহ)
ই-পাসপোর্ট (e-Passport) কী এবং কেন এটি প্রয়োজন?
বর্তমান ডিজিটাল বাংলাদেশের অন্যতম বড় একটি সাফল্য হলো ই-পাসপোর্ট বা ইলেকট্রনিক পাসপোর্ট। এটি সাধারণ এমআরপি (MRP) বা মেশিন রিডেবল পাসপোর্টের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ ও আধুনিক। ই-পাসপোর্টের ভেতরে একটি ইলেকট্রনিক মাইক্রোচিপ থাকে, যেখানে পাসপোর্টধারীর বায়োমেট্রিক তথ্য এবং ব্যাক্তিগত বিবরণ সুরক্ষিতভাবে সংরক্ষিত থাকে।
বিশ্বজুড়ে ভ্রমণের সময় বিমানবন্দরে ই-গেট (e-Gate) ব্যবহারের মাধ্যমে দ্রুত ও নির্বিঘ্নে ইমিগ্রেশন পার হওয়ার জন্য ই-পাসপোর্ট অত্যন্ত জরুরি। জালিয়াতি রোধ, সর্বোচ্চ নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক মানের সুবিধা পাওয়ার জন্য বর্তমানে বাংলাদেশে নতুন পাসপোর্ট করা বা পুরোনো পাসপোর্ট নবায়নের ক্ষেত্রে ই-পাসপোর্ট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
ই-পাসপোর্ট আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
অনলাইনে ফরম পূরণ শুরু করার আগেই প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র সাথে গুছিয়ে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ বায়োমেট্রিক ও ছবি তোলার দিনে পাসপোর্ট অফিসে এই কাগজপত্রগুলো সাথে নিয়ে যেতে হবে। নিচে বয়স ও ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় দলিলের তালিকা দেওয়া হলো:
১৮ বছর এবং তার বেশি বয়সীদের জন্য:
- জাতীয় পরিচয়পত্র (NID): মূল কপি এবং রঙিন ফটোকপি (NID অনুযায়ী পাসপোর্টের সব তথ্য পূরণ হবে)।
- অনলাইন আবেদন ফরম: অনলাইনে পূরণকৃত ফরমের প্রিন্ট কপি।
- আবেদন সারাংশ (Application Summary): বারকোডসহ প্রিন্টকৃত কপি।
- পেমেন্ট স্লিপ: ই-চালান (A-Challan) বা অনলাইন পেমেন্ট কনফার্মেশন স্লিপ।
- পুরোনো পাসপোর্ট (যদি থাকে): রি-ইস্যুর ক্ষেত্রে মূল পাসপোর্ট এবং ডাটা পেজের ফটোকপি।
- পেশাগত প্রমাণপত্র: চাকরিজীবী হলে GO/NOC/Student ID বা পেশার সপক্ষে সনদপত্র।
১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য:
- অনলাইন জন্ম নিবন্ধন সনদ (BRC): ১৭ ডিজিটের ডিজিটাল জন্ম সনদ এবং ফটোকপি।
- পিতা-মাতার NID: মা এবং বাবার জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি।
- ছবি: পাসপোর্ট সাইজের ৩R ল্যাব প্রিন্ট ছবি (ধূসর ব্যাকগ্রাউন্ডসহ)।
ই-পাসপোর্ট ফি তালিকা ২০২৬ (১৫% ভ্যাটসহ)
ই-পাসপোর্টের ফি নির্ভর করে পাসপোর্টের মেয়াদ (৫ বছর বা ১০ বছর), পৃষ্ঠার সংখ্যা (৪৮ পৃষ্ঠা বা ৬৪ পৃষ্ঠা) এবং ডেলিভারির ধরনের উপর। বাংলাদেশ সরকার নির্ধারিত ১৫% ভ্যাটসহ সঠিক ফি-এর তালিকা নিচে টেবিলে দেওয়া হলো:
| মেয়াদ | পৃষ্ঠা সংখ্যা | নিয়মিত ফি (১৫ কার্যদিবস) | এক্সেপ্রেস ফি (৭ কার্যদিবস) | সুপার এক্সপ্রেস ফি (২ কার্যদিবস) |
|---|---|---|---|---|
| ৫ বছর | ৪৮ পৃষ্ঠা | ৪,০২৫ টাকা | ৬,৩২৫ টাকা | ৮,৬২৫ টাকা |
| ৫ বছর | ৬৪ পৃষ্ঠা | ৬,৩২৫ টাকা | ৮,৬২৫ টাকা | ১২,০৭৫ টাকা |
| ১০ বছর | ৪৮ পৃষ্ঠা | ৫,৭৫০ টাকা | ৮,০৫০ টাকা | ১০,৩৫০ টাকা |
| ১০ বছর | ৬৪ পৃষ্ঠা | ১০,৩৫০ টাকা | ১২,০৭৫ টাকা | ১৩,৮০০ টাকা |
অনলাইনে ই-পাসপোর্ট আবেদন করার সহজ ৬টি ধাপ
এখন পাসপোর্ট অফিসে দালালের খপ্পরে না পড়ে ঘরে বসেই নিজের মোবাইল বা কম্পিউটার দিয়ে আবেদন করা সম্ভব। নিচে ধাপগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
ধাপ ১: সরকারি পোর্টালে রেজিস্ট্রেশন করা
প্রথমেই বাংলাদেশ সরকারের ই-পাসপোর্টের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট (epassport.gov.bd)-এ প্রবেশ করুন। এরপর আপনার জেলা এবং সংশ্লিষ্ট থানা নির্বাচন করে পরীক্ষা করুন আপনার এলাকায় ই-পাসপোর্ট সেবা চালু আছে কিনা। তারপর একটি সচল ইমেইল ও পাসওয়ার্ড দিয়ে একাউন্ট তৈরি করুন।
ধাপ ২: ব্যক্তিগত তথ্যাবলী সঠিকভাব পূরণ করা
একাউন্টে লগইন করে "Apply for a new e-Passport" অপশনে ক্লিক করুন। আপনার জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) অনুযায়ী নিজের নাম, পিতা-মাতার নাম, স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা হুবহু ইংরেজি ও বাংলায় টাইপ করুন। বানান ভুলের বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক থাকুন।
ধাপ ৩: পেশা ও জরুরি যোগাযোগের ঠিকানা নির্বাচন
আপনার বর্তমান পেশা (যেমন: ছাত্র, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী) এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্বাচন করুন। কোনো জরুরি প্রয়োজনে কার সাথে যোগাযোগ করা হবে (Emergency Contact), তার নাম, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর সঠিক স্থানে দিন।
ধাপ ৪: পাসপোর্টের মেয়াদ ও পৃষ্ঠা নির্বাচন
এই ধাপে আপনি পাসপোর্টের মেয়াদ ৫ বছর নাকি ১০ বছর এবং পৃষ্ঠা সংখ্যা ৪৮ নাকি ৬৪ নেবেন তা সিলেক্ট করুন। ১৮ বছরের কম এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য কেবল ৫ বছর মেয়াদের পাসপোর্ট প্রযোজ্য হয়।
ধাপ ৫: পাসপোর্ট ফি প্রদান (Payment Options)
আপনি অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে (যেমন: বিকাশ, নগদ, রকেট, ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড) অথবা সরকারি এ-চালানের (A-Challan) মাধ্যমে নির্ধারিত ব্যাংকে ফি জমা দিতে পারেন। পেমেন্ট সম্পন্ন হলে ই-চালান স্লিপটি পিডিএফ হিসেবে সেভ ও প্রিন্ট করে রাখুন।
ধাপ ৬: অ্যাপয়েন্টমেন্ট তারিখ গ্রহণ ও ফরম ডাউনলোড
ফি দেওয়া শেষ হলে আপনার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে বায়োমেট্রিক দেওয়ার জন্য একটি সুবিধাজনক তারিখ ও সময় নির্বাচন করুন। আবেদন শেষে Application Summary এবং Online Application Form প্রিন্ট করে রাখুন।
পাসপোর্ট অফিসে বায়োমেট্রিক ও ছবি তোলার দিন করণীয়
নির্ধারিত তারিখ ও সময়ে প্রয়োজনীয় সব কাগজের মূল কপি এবং ফটোকপি সাথে নিয়ে পাসপোর্ট অফিসে সরাসরি উপস্থিত হন। অফিসে গমনের দিন যেসব বিষয় মাথায় রাখবেন:
- পোশাক নির্বাচন: ছবি তোলার দিন গাঢ় রঙের পোশাক পরুন (সাদা পোশাক এড়িয়ে চলুন, কারণ ব্যাকগ্রাউন্ড সাদা থাকে)।
- হাতের পরিচ্ছন্নতা: ফিংগারপ্রিন্ট বা আঙুলের ছাপ দেওয়ার জন্য দুই হাতের আঙুল পরিষ্কার ও শুকনো রাখুন।
- কাগজপত্র গুছানো: NID-এর মূল কপি, প্রিন্ট ফরম, চালানের কপি ক্রমানুসারে পিনআপ করে রাখুন।
- ডেলিভারি স্লিপ সংরক্ষণ: বায়োমেট্রিক এবং আইরিশ স্ক্যান শেষে কর্মকর্তা আপনাকে একটি Delivery Slip দেবেন। পাসপোর্ট তোলার দিন এটি সাথে আনতে হবে, তাই স্লিপটি সযত্নে রেখে দিন।
অনলাইনে ই-পাসপোর্ট স্ট্যাটাস চেক করার নিয়ম
আবেদন জমা দেওয়ার পর আপনার ই-পাসপোর্টটি কোন পর্যায়ে আছে (যেমন: প্রিন্টিং, শিপিং বা ডেলিভারির জন্য তৈরি) তা ঘরে বসেই চেক করা যায়। এজন্য নিচের নিয়মটি অনুসরণ করুন:
প্রথমেই epassport.gov.bd/authorization/application-status পেজে যান। আপনার ডেলিভারি স্লিপে থাকা Application ID বা OID Number এবং জন্ম তারিখ প্রদান করে "Check" বাটনে ক্লিক করলেই স্ক্রিনে আপনার পাসপোর্টের বর্তমান অবস্থা দেখতে পাবেন।
ই-পাসপোর্ট করতে কতদিন সময় লাগে?
ই-পাসপোর্ট পেতে কতদিন সময় লাগবে তা নির্ভর করে ডেলিভারির ক্যাটাগরির ওপর। নিয়মিত (Regular) আবেদনে সাধারণত ১৫ কার্যদিবস বা ২১ দিন, এক্সপ্রেস (Express) আবেদনে ৭ কার্যদিবস এবং সুপার এক্সপ্রেস (Super Express) আবেদনে মাত্র ২ কার্যদিবসের মধ্যে পাসপোর্ট পাওয়া যায়।
১৮ বছরের নিচে শিশুদের জন্য ই-পাসপোর্টের মেয়াদ কত বছর হয়?
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সী নাগরিকদের জন্য কেবল ৫ বছর মেয়াদের ই-পাসপোর্ট প্রদান করা হয়। ১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সীরা ৫ বছর বা ১০ বছর মেয়াদের যেকোনো একটি ই-পাসপোর্ট বেছে নিতে পারেন।
জরুরী প্রয়োজনে ই-পাসপোর্ট দ্রুত পাওয়ার উপায় কি?
জরুরী বা অতিসত্বর পাসপোর্ট পেতে চাইলে Super Express Delivery অপশন সিলেক্ট করে আবেদন করতে হবে। এর জন্য নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে সরাসরি প্রধান কার্যালয় বা আঞ্চলিক অফিসে বায়োমেট্রিক সম্পন্ন করলে পুলিশ ভেরিফিকেশন সাপেক্ষে মাত্র ২ কার্যদিবসের মধ্যে পাসপোর্ট ডেলিভারি দেওয়া হয়।
উপসংহার
ই-পাসপোর্ট তৈরির প্রক্রিয়াটি আগে জটিল মনে হলেও অনলাইনের সুবাদে এটি এখন অত্যন্ত সহজ ও শিক্ষণীয়। দালাল বা কোনো তৃতীয় পক্ষের ওপর নির্ভর না করে সঠিক তথ্যাবলী দিয়ে নিজেই অনলাইনে ফরম পূরণ করুন। এতে সময় ও অতিরিক্ত অর্থ দুটোই বাঁচবে। আশা করি এই নির্দেশিকা অনুসরণ করে আপনি খুব সহজেই আপনার ই-পাসপোর্ট আবেদনটি সম্পন্ন করতে পারবেন।
প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
ই-পাসপোর্ট (e-Passport) কী এবং কেন এটি প্রয়োজন?
বর্তমান ডিজিটাল বাংলাদেশের অন্যতম বড় একটি সাফল্য হলো ই-পাসপোর্ট বা ইলেকট্রনিক পাসপোর্ট। এটি সাধারণ এমআরপি (MRP) বা মেশিন রিডেবল পাসপোর্টের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ ও আধুনিক। ই-পাসপোর্টের ভেতরে একটি ইলেকট্রনিক মাইক্রোচিপ থাকে, যেখানে পাসপোর্টধারীর বায়োমেট্রিক তথ্য এবং ব্যাক্তিগত বিবরণ সুরক্ষিতভাবে সংরক্ষিত থাকে।
১৮ বছরের নিচে শিশুদের জন্য ই-পাসপোর্টের মেয়াদ কত বছর হয়?
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সী নাগরিকদের জন্য কেবল ৫ বছর মেয়াদের ই-পাসপোর্ট প্রদান করা হয়। ১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সীরা ৫ বছর বা ১০ বছর মেয়াদের যেকোনো একটি ই-পাসপোর্ট বেছে নিতে পারেন।
জরুরী প্রয়োজনে ই-পাসপোর্ট দ্রুত পাওয়ার উপায় কি?
জরুরী বা অতিসত্বর পাসপোর্ট পেতে চাইলে Super Express Delivery অপশন সিলেক্ট করে আবেদন করতে হবে। এর জন্য নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে সরাসরি প্রধান কার্যালয় বা আঞ্চলিক অফিসে বায়োমেট্রিক সম্পন্ন করলে পুলিশ ভেরিফিকেশন সাপেক্ষে মাত্র ২ কার্যদিবসের মধ্যে পাসপোর্ট ডেলিভারি দেওয়া হয়।
You must be logged in to post a comment.